বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

বিভিন্ন সুত্রমতে মনে করা হয় বাংলাদেশে প্রায় ২,৫০০ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪৫২টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এসব প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে থাকে। তেমনি আমাদের দেশের কিছু বিখ্যাত কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানসমূহ সম্পর্কে আসুন জেনে নেই।

১। আহসান মঞ্জিল

ahosan-monjil-dhaka
Image Source: Mapio.net

আহসান মঞ্জিলের প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আবদুল গণি, এটি পুরাণ ঢাকার ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। ১৮৫৯ সালের ভবনটির নির্মান শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৮৭২ সালে। নওয়াব আবদুল গণি তার ছেলের নাম অনুসারে ভবনটির নাম দেন আহসান মঞ্জিল। এ ভবনটি অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী যেমন ১৯০৬ সালে এই ভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমানে ভবনটি জাদুঘর হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিস্তারিতআহসান মঞ্জিল ভ্রমণ গাইড

২। উয়ারী বটেশ্বর

uyari-boteshor
Image Source: bnstimes24.com

ঢাকা থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হচ্ছে উয়ারী বটেশ্বর। মাটির নিচে অবস্থিত দুর্গ-নগরীটি এটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো।

৩। কান্তজীউ মন্দির

kantojio-mondir-dinajpur
Image Source: Mapio.net

দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার এবং কাহারোল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সুন্দরপুর ইউনিয়নে, দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরে একটি প্রাচীন মন্দির হচ্ছে কান্তজীউ মন্দির। তিনতলাবিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিলো বলে এটি নবরত্ন মন্দির নামেও পরিচিত। মন্দিরটি ১৮ শতকে নির্মিত চমৎকার একটি ধর্মীয় স্থাপনা। এটি কৃষ্ণের মন্দির হিসেবে পরিচিত যা লৌকিক রাধা-কৃষ্ণের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে বাংলায় প্রচলিত। মহারাজা সুমিত ধর শান্ত এখানেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

বিস্তারিতকান্তজীউ মন্দির ভ্রমণ

৪। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার

paharpur
Image Source: Chapaibarta.com

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। এটি সোমপুর বিহার বা সোমপুর মহাবিহার নামেও পরিচিত। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপালদেব নবম শতকে এই বিহার তৈরি করছিলেন। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এটি আবিষ্কার করেন। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। পাহাড়পুরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার বলা যেতে পারে। ৩০০ বছর ধরে এটি চীন, তিব্বত, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধদের কাছে বিখ্যাত ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র ছিল।

বিস্তারিত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ভ্রমণ

৫। বড়কুঠি

borokuthi
Image Source: prothom-alo.com

বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন ইমারতের নাম বড়কুঠি। ভিন্ন সুত্র মতে ধারণা করা হয় বড়কুঠির নির্মাণকাল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। প্রথমে ওলন্দাজ বা ডাচদের বাবসাকেন্দ্র ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ডাচরা ভারতে যখন তাদের কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৮১৪ সালে ইংরেজদের সাথে একটি চুক্তি করে বড়কুঠিসহ ভারতের সকল বাবসা কেন্দ্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হস্তান্তর করে। ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত এটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথম প্রশাসনিক ভবন হিসাবে বড়কুঠিকে ব্যবহার করা হয়।

৬। মহাস্থানগড়

mohasthangor-bogura
Image Source: flash.com.bd

বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত মহাস্থানগড়ের পূর্ব নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি হিসাবে পরিচিত। এক সময় এটি বাংলার রাজধানী ছিল। এখানে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন সাম্রাজ্যের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে।

বিস্তারিতমহাস্থানগড় ভ্রমণ

৭। মুঘল ঈদগাহ

mughal-eidgah-dhaka
Image Source: parjatan.portal.gov.bd

ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোড এলাকায় প্রাচীরেবেষ্টিত মাঠটি মুঘল ঈদগাহ্। এটি ধানমন্ডি ঈদগাহ্ নামে বহুল পরিচিত। ঈদগাহের কেন্দ্রীয় মেহরাবের শিলালিপি থেকে জানা যায় ঈদগাহ্ প্রায় চারশ বছর আগে শাহ্ সুজার আমলে তাঁর দেওয়ান মীর আবুল কাসিম কর্তৃক নির্মিত। প্রায় আড়াইশ ফুট দৈর্ঘ্য এবং দেড়শ ফুট প্রস্থে চুন-সুরকির প্রাচীর বেষ্টিত থাকলেও বর্তমানে কেবলমাত্র পশ্চিম দিকের মূল উঁচু দেয়ালটি দন্ডায়মান। ঈদগাহটি পর্যটকগণের জন্য একটি আকর্ষনীয় স্থান।

৮। ময়নামতি

moinamoti-kumilla
Image Source: ajkersangbad.com

ময়নামতি কুমিল্লায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থান। লালমাই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন হল ময়নামতি প্রত্নস্থল। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে জয়কর্মান্তবসাক নামে ময়নামতির এ অঞ্চলটি একটি প্রাচীন নগরী ও বৌদ্ধ বিহারের অবশিষ্টাংশ।

বিস্তারিতময়নামতি ভ্রমণ

৯। লালবাগ কেল্লা

lalbag-kella-dhaka
Image Source: touristguide24.com

লালবাগের কেল্লা ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রাচীন দুর্গ। মোঘল আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে লালবাগের কেল্লা দাঁড়িয়ে আছে। পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত বলেই এটির নামকরন করা হয়েছে লালবাগের কেল্লা। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনস্থল হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ এই কেল্লা এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে।

বিস্তারিতলালবাগ কেল্লা ভ্রমণ

১০। ষাট গম্বুজ মসজিদ

shat-gomvuj-moshjid
Image Source: shorob.com

ষাট গম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি না থাকায় এটি কে নির্মাণ করেছিলেন সে সম্বন্ধে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি। মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখে খান-ই-জাহান নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারনা পাওয়া যায়। ১৫শ শতাব্দীতে এটি নির্মিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য এর মর্যাদা দেয়।

বিস্তারিতষাট গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ

১১। সোনারগাঁও

Sonargaon-narayangonj
Image Source: anannya.com.bd

সোনারগাঁও বাংলার মুসলিম শাসকদের অধীনে পরিচালিত একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র। ঢাকা থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরে বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা হচ্ছে সোনারগাঁও। ধারনা করা হয় বিস্তৃত এ জনপদটি পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী ও উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল।

বিস্তারিতসোনারগাঁও ভ্রমণ

এই ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো আমাদের দেশের অমূল্য সম্পদ। আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। এই নিদর্শন গুলোতে ভ্রমণ করতে গেলে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যেন কোন ক্ষতি না হয় এবং জায়গাগুলোর সৌন্দর্য্য রক্ষায় আমাদের সচেতন থাকা উচিৎ। প্রিয়জনদের জানাতে শেয়ার করুণ তাদের সাথে।

Leave a Comment